ঢাকা , বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬ , ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুনে কমেছে অর্থনীতির গতি, সতর্কবার্তা দিচ্ছে পিএমআই

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ০৮-০৭-২০২৬ ০২:৫৫:৫৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৮-০৭-২০২৬ ০২:৫৫:৫৩ অপরাহ্ন
জুনে কমেছে অর্থনীতির গতি, সতর্কবার্তা দিচ্ছে পিএমআই ফাইল ছবি
জুন মাসে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলেও সেই গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সর্বশেষ পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) বলছে, মে মাসে ঈদকেন্দ্রিক চাহিদার কারণে যে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ধারা তৈরি হয়েছিল, জুনে তা অনেকটাই শ্লথ হয়েছে। ফলে উৎপাদন ও নির্মাণ খাত আবার সংকোচনে ফিরেছে, আর কৃষি ও সেবা খাতে সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলেও তার গতি কমেছে।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, জুনে বাংলাদেশের সামগ্রিক পিএমআই দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ৯। মে মাসে যা ছিল ৬২ দশমিক ৮। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে সূচকটি ৯ দশমিক ৯ পয়েন্ট কমেছে। যদিও ৫০-এর ওপরে থাকায় অর্থনীতি এখনও সম্প্রসারণ পর্যায়েই রয়েছে।

এক মাসে প্রায় ১০ পয়েন্টের এই পতন অর্থনীতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ পিএমআইয়ে ৫০-এর ওপরে থাকা সম্প্রসারণ নির্দেশ করলেও সূচকের এত বড় পতন ব্যবসায়িক গতি কমে যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষি খাত টানা দশম মাসের মতো সম্প্রসারণে রয়েছে। নতুন ব্যবসা, উৎপাদন কার্যক্রম, কর্মসংস্থান এবং উপকরণ ক্রয়ের প্রবৃদ্ধির কারণে খাতটি ইতিবাচক অবস্থানে থাকলেও মে মাসের তুলনায় সম্প্রসারণের গতি কমেছে। 

জুনের প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় উৎপাদন খাত। নতুন ক্রয়াদেশ কমেছে, রপ্তানি আদেশ দুর্বল হয়েছে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি থেমে গেছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় ধীরগতি দেখা দিয়েছে। এর ফলে ম্যানুফ্যাকচারিং খাত আবার সংকোচনে ফিরে গেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শিল্প খাত প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। তৈরি পোশাক, ভোগ্যপণ্য, ওষুধ, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশলসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন কমে গেলে তার প্রভাব কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং ব্যাংকঋণ, সব ক্ষেত্রেই পড়তে পারে।

নির্মাণ খাতও জুনে সংকোচনে চলে গেছে। নতুন প্রকল্পের গতি কমে যাওয়া, নির্মাণসামগ্রীর উচ্চ মূল্য, অর্থায়নের ব্যয় বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতিকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশে নির্মাণ খাত শুধু আবাসন নয়, সিমেন্ট, রড, সিরামিক, কাচ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও পরিবহনসহ বহু শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এই খাতের দুর্বলতা সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে।

জুনের পিএমআইতে ইতিবাচক দিক হলো কৃষি ও সেবা খাত এখনও সম্প্রসারণে রয়েছে। কৃষি খাত টানা দশম মাস এবং সেবা খাত টানা একুশতম মাস সম্প্রসারণ ধরে রেখেছে। তবে, দুটি খাতেই নতুন ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন কার্যক্রমের গতি মে মাসের তুলনায় কমেছে। অর্থাৎ অর্থনীতির ইতিবাচক ধারা বজায় থাকলেও তার শক্তি আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে।

প্রতিবেদনে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এলপিজি ও জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয়, শ্রম ব্যয় এবং পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের লাভের মার্জিন কমে এসেছে।

এছাড়া, চলমান অবকাঠামো নির্মাণকাজের কারণে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব, কার্যকরী মূলধনের সংকট এবং নতুন ভ্যাট কাঠামোর প্রভাবও ব্যবসার ওপর চাপ তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজ বলেছেন, ‍“জুনের পিএমআই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে খাতভেদে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। কৃষি ও সেবা খাত ইতিবাচক থাকলেও তাদের প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। অন্যদিকে, উৎপাদন ও নির্মাণ খাতের দুর্বলতা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ধীর করেছে।” 

তার মতে, নতুন অর্ডার, রপ্তানি এবং কর্মসংস্থানের গতি বাড়ানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জুলাই থেকে নতুন অর্থবছর শুরু হয়েছে। সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেসরকারি খাতকে চাঙা করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু পিএমআইয়ের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সেই লক্ষ্য অর্জনে শুধু নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট হবে না; শিল্প ও ব্যবসা খাতের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপও জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ সুদের হার ধীরে ধীরে কমানো, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পকে সহায়তা দেওয়া গেলে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে অর্থনীতির গতি আবার বাড়তে পারে।

পিএমআইয়ের ফিউচার বিজনেস ইনডেক্স কিছুটা আশার কথাও বলছে। এতে কৃষি, নির্মাণ ও সেবা খাতে আগামী মাসগুলোতে সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। 

উৎপাদন খাতেও পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা রয়েছে। তবে, সেই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ দিতে হলে ব্যবসায়িক ব্যয় কমানো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

জুনের পিএমআইকে অর্থনীতির জন্য ‘লাল সংকেত’ বলা যাবে না। কারণ সামগ্রিক সূচক এখনও ৫০-এর ওপরে। তবে, এটিকে উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। এক মাসে প্রায় ১০ পয়েন্টের পতন দেখিয়ে দিয়েছে, অর্থনীতির গতি ধরে রাখতে হলে শিল্প, নির্মাণ ও বিনিয়োগ খাতকে দ্রুত শক্তিশালী করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে কৃষি ও সেবা খাত প্রবৃদ্ধিকে ধরে রাখলেও দীর্ঘমেয়াদে শিল্প উৎপাদন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। জুনের পিএমআই সেই বাস্তবতারই আরেকটি স্পষ্ট স্মারক।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ